বঙ্গবন্ধু টাইমলাইনঃ তৃতীয় পর্ব

 


 পূর্ববর্তী পর্ব পড়ুন 


❑ ১৯৭১


৩ জানুয়ারি মুজিব রেসকোর্স মাঠে একটি সভায় জনগণের প্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগ সদস্যরা ছয় দফা দাবির ভিত্তিতে একটি সংবিধান গঠনের শপথ গ্রহণ করে এবং তাদেরকে যারা নির্বাচিত করেছেন সেই জনগণের

প্রতি অনুগত থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। ৫ জানুয়ারি, পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো আওয়ামী লীগের সাথে কেন্দ্রে জোট সরকার গঠনের প্রস্তুতি ঘোষণা করেন। মুজিব তার দলের জাতীয় সংসদ (এমএনএ) সদস্যদের একটি সভায় আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হন। ২৮ জানুয়ারি জুলফিকার আলী ভুট্টো মুজিবের সাথে আলোচনার জন্য ঢাকায় পৌঁছেছিলেন। তিন দিনের আলোচনার পরে আলোচনা ব্যর্থ হয়। ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের বৈঠক আহ্বান করেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো ঢাকায় জাতীয় পরিষদের বৈঠক বয়কটের ঘোষণা দিয়ে দুই প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দুই দলের প্রতি ক্ষমতা হস্তান্তর করার দাবি জানান। ১৬ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু এক বিবৃতিতে জনাব ভুট্টোর দাবির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ভুট্টো সাহেবের দাবি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ক্ষমতা একমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। ক্ষমতার মালিক এখন পূর্ব বাংলার জনগণ।


১ মার্চ ইয়াহিয়া খান বেতার ভাষণের মাধ্যমে অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদের বৈঠক স্থগিতের ঘোষণা দিলে সারা বাংলায় প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বঙ্গবন্ধুর সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগ কার্যকরী পরিষদের জরুরি বৈঠকে ২ মার্চ (ঢাকায়) ও ৩ মার্চ দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করা হয়। ৩ মার্চ সারা বাংলায় হরতাল পালিত হবার পর বঙ্গবন্ধু অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্য প্রেসিডেন্টের প্রতি দাবি জানান।


৭ মার্চ রেসকোর্সের জনসমুদ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বক্তব্য রাখেন, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা’ । ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে শৃঙ্খল মুক্তির আহ্বান জানিয়ে ঘোষণা করেন, “প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।..... রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।"


মুজিব শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনের জন্য জনগণকে নিজেদের প্রস্তুত করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি জনগণকে ইয়াহিয়া খান সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করতে বলেন। একদিকে ইয়াহিয়া খানের পক্ষ থেকে আদেশ ছিল, অন্যদিকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোড থেকে মুজিবের নির্দেশ ছিল। পুরো জাতি মুজিবের নির্দেশ পালন করেছিল। সরকারী অফিস, আদালত, ব্যাংক, বীমা সংস্থা, স্কুল, কলেজ, কল-কারখানা সহ প্রতিটি সংস্থা তার আদেশ মান্য করে। তাঁর আহ্বানে বাংলাদেশের মানুষের অপ্রতিরোধ্য সাড়া এই অঞ্চলের ইতিহাসে নজিরবিহীন ছিল।


৮ মার্চ থেকে পূর্ব পাকিস্তান সরকার কার্যত অচল। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশবলেই বেসামরিক প্রশাসন পরিচালিত। বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২নং রোডের বাসভবন পূর্ব বাংলার কেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৬ মার্চ ইয়াহিয়া-মুজিব আলোচনা ঢাকায়। ৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের ইচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করেন বঙ্গবন্ধু। ২১ মার্চ পর্যন্ত ৫ বার বৈঠক। ২২ মার্চ ভুট্টো আলোচনায় যোগ দেন। সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি সৈনিকরাও নিজেদেরকে সংগঠিত করেন। বিভিন্ন সেনানিবাসে বাঙালি ও ইপিআর-এর সৈনিক, পুলিশ ও আনসারদের মধ্যে পাকিস্তান-বিরোধী ক্ষোভ। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া খানের গোপনে ঢাকা ত্যাগ। মাঝরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত গণহত্যা শুরু। বিভিন্ন সেনানিবাসে বাঙালি সৈনিক, ঢাকায় ইপিআর সদর দফতর ও রাজারবাগ পুলিশলাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতিতে আক্রমণ। ঢাকা মৃত ও ধ্বংসের নগরে পরিণত।


বঙ্গবন্ধু ২৫শে মার্চ রাত ১২টা ২০ মিনিটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন: This may be my last message, from today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.

 [অনুবাদ: এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণ, তোমরা যে যেখানেই আছো এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শেষ পর্যন্ত দখলদার সৈন্য বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য আমি তোমাদের আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈনিকটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।] এই ঘোষণা বাংলাদেশের সর্বত্র ওয়্যারলেসের মাধ্যমে প্রেরিত হয়। এর সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বাংলায় নিম্নলিখিত একটি বার্তা পাঠানঃ

পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিতভাবে পিলখানা ইপিআর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে এবং শহরের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে, আমি বিশ্বের জাতিসমূহের কাছে সাহায্যের আবেদন করেছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সঙ্গে মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে আপনাদের কাছে আমার আবেদন ও আদেশ দেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। আপনাদের পাশে এসে যুদ্ধ করার জন্য পুলিশ, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও আনসারদের সাহায্য চান। কোন আপোস নাই। জয় আমাদের হবেই। পবিত্র মাতৃভূমি থেকে শেষ শত্রুকে বিতাড়িত করুন। সকল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিক প্রিয় লোকদের কাছে এ সংবাদ পৌঁছে দিন। আল্লাহ আপনাদের মঙ্গল করুন। জয় বাংলা।

২৬ শে মার্চ, চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম.এ. হান্নান চট্টগ্রাম রেডিওতে মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পড়েন। ১০ এপ্রিল মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার রাষ্ট্রপতি হিসাবে গঠিত হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ট্যাংকসহ কয়েক ট্রাক সৈন্য রাত একটার পরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবন ঘেরাও করে গোলাগুলি শুরু করে। গ্রেফতার করে তাঁকে ৩ দিন ঢাকায় আটকে রেখে পরে বিমানে করাচী নিয়ে যাওয়া হয়। ২৬ মার্চ নেতার ভাষণে ইয়াহিয়া কর্তৃক বঙ্গবন্ধুকে ‘পাকিস্তানের প্রতি বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চরম শাস্তিদান' ও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা। গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চলতে থাকে। বাঙালি সৈন্য, ইপিআর, পুলিশ, জনতা পূর্ব বাংলার বৃহৎ অঞ্চল মুক্ত রাখেন। চট্টগ্রাম বেতারকেন্দ্রকে বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে রূপান্তর করে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ। সারা দেশে সশস্ত্র প্রতিরোধ। 'বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রচার। লক্ষ লক্ষ লোকের সীমান্ত পার হয়ে ভারতে আশ্রয়। পূর্ব বাংলা থেকে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী এবং এম. এ. জি. ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি করে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠন। সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর প্রতিরোধ। বছরের মাঝামাঝি তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা। দেশের মধ্যেও গেরিলাদল গড়ে উঠে। বাংলাদেশে গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বের বিবেকবান মানুষ সোচ্চার। বিভিন্ন স্থানে বাঙ্গালি কূটনীতিকদের পাকিস্তানের পক্ষত্যাগ করে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য। এপ্রিল এ জামাতে ইসলামী ও মুসলিম লীগের নেতৃত্বে শাস্তি কমিটি, রাজাকার, আল বদর ও আল শামস বাহিনী গঠন। শুরু হয় মানবতা বিরোধী অপরাধ। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সর্বাত্মক সহায়তা সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে চীন ব্যতীত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সমর্থন। বর্ষা মৌসুমে গেরিলা যোদ্ধাদের সাফল্য। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের 'বজ্রকণ্ঠ' এবং 'জয় বাংলার জয়' জনতাকে উদ্দীপ্ত করে। মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার জন্য ভাসানীর নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ ও কংগ্রেসকে নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন


বঙ্গবন্ধুকে লায়ালপুর কারাগারে নির্জন সেল এ বন্দি। ৩ আগস্ট পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার জন্য শেখ মুজিবের বিচার শুরু। জাতিসংঘ মহাসচিব উত্থান্ট, সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট পদগনি, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাসহ বিশ্ব নেতাদের তীব্র প্রতিবাদ। বিচার চলাকালে বঙ্গবন্ধুর আত্মপক্ষ সমর্থনে অস্বীকার। প্রহসনমূলক বিচারের পর ৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের ফায়জালাবাদ (লায়ালপুর) জেলে বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী ঘোষণা করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতিতে এ রায় কার্যকর করা সম্ভব হয় নি। শীতের শুরু থেকে গেরিলা আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী কার্যত সেনানিবাস ও ক্যাম্পগুলোতে অবরুদ্ধ। ২১ নভেম্বর বাংলাদেশের স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর সম্মিলিত অভিযান শুরু। এদিনেই ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তি বাহিনীর সমন্বয়ে মিত্রবাহিনীর যৌথ বাহিনীর কমান্ড গঠন। ৩ ডিসেম্বর সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু। পরের সপ্তাহে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় অবরুদ্ধ। জাতিসংঘে পাকিস্তানের মিত্ররা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এনে মুক্তিযুদ্ধ কে থামাতে চাইলে সোভিয়েত ভেটোর ফলে সে চাতুরী ব্যর্থ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খোঁড়া অজুহাতে বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর প্রেরণ করে। ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে পাকবাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজি ৯৩ হাজার সৈন্যসহ মিত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করে।


চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে বাংলাদেশ। পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নেয় স্বাধীন সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ'। সফল হয় মুজিবের স্বপ্ন। এ সময় বঙ্গবন্ধুকে লয়ালপুর থেকে মিয়ানওয়ালী জেলে নেওয়া হয়। ২৬ ডিসেম্বর তাঁকে রাওয়ালপিন্ডির অতিথি ভবনে নিয়ে আসে। ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জাতির জনক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি প্রদানের দাবি জানানো হয়। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি, কাজেই পাকিস্তানের কোন অধিকার নেই তাকে বন্দি করে রাখার। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বহু রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভ করেছে।



❑ ১৯৭২


আন্তর্জাতিক চাপের কাছে মাথা নত করে পাকিস্তান সরকার ১৯৭২ সালের ৮ ই জানুয়ারি মুজিবকে মুক্তি দেয়। এর মধ্যে ভুট্টোর কয়েকবার পাকিস্তান-বাংলাদেশ নিয়ে ফেডারেশন করার প্রস্তাব করলে বঙ্গবন্ধুর অসম্মতি ৮ জানুয়ারি বিশেষ বিমানে বঙ্গবন্ধু ও ড. কামাল হোসেন লন্ডনে যান। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিথ ও বিরোধী নেতা উইলসনের সঙ্গে সাক্ষাত। ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানে ৯ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর দিল্লি যাত্রা। বিমানবন্দরে ভারতের রাষ্ট্রপতি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি তাঁকে স্বাগত জানান। সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে সেখানে বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা করেন। এরপর ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা। বঙ্গবন্ধুর আগমনের খবরে উল্লসিত বাংলাদেশ। ঢাকা নগরী লোকারণ্য। বিকেল ৩ টায় বঙ্গবন্ধুর বিমান ঢাকায় নামলে জনসমুদ্রের মধ্য দিয়ে তাঁকে বহনকারী ট্রাক রেসকোর্সে পৌঁছে। রেসকোর্সের জনসভায় আবেগাপ্লুত ভাষণে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ কে নতুন করে গড়ে তোলার আহ্বান। এরপর ফিরে যান পরিজনদের কাছে ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডের বাসায়, যেখানে তার পরিবার ৯ মাস দুঃসহ বন্দি জীবন কাটিয়েছেন।


জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি ঢাকায় পৌঁছালে তাঁকে অবিস্মরণীয় সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দর থেকে সরাসরি রেসকোর্স ময়দানে গিয়ে লক্ষ জনতার সমাবেশ থেকে অশ্রুসিক্ত নয়নে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরী নতুন রাষ্ট্রপতি। বঙ্গবন্ধুর সরকারের সামনে পাকবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ বিধ্বস্ত একটি দেশকে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ। গৃহহীন সম্বলহীন ১ কোটি শরণার্থী ফিরছে দেশে। ১ লক্ষের বেশি মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র সমর্পণ করেন বঙ্গবন্ধুর কাছে। ২৬ মার্চ ভারী শিল্প-কারখানা, ব্যাংক-বিমা প্রভৃতি জাতীয়করণের ঘোষণা। বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরিহার এবং সর্বজনীন শিক্ষার অঙ্গিকার করে নতুন সরকার। ফেব্রুয়ারিতে কলকাতার প্যারেড গ্রাউন্ডে বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা। মার্চেই ইন্দিরা গান্ধির ঢাকা সফর।


৬ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকারের আমন্ত্রণে তিনি ভারত যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৯৪৯ বঙ্গবন্ধুকে দেয়া বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরে যান। ১২ মার্চ বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ভারতীয় মিত্রবাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করে।


১ মে তিনি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা দেন। ৩০ জুলাই লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর পিত্তকোষে অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর লন্ডন থেকে তিনি জেনেভা যান। ১০ অক্টোবর বিশ্বশান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরী’ পুরস্কার প্রাপ্তির নাম ঘোষণা করা হয়। ৪ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের তারিখ (৭ মার্চ, ১৯৭৩) ঘোষণা করেন। ১৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় খেতাব প্রদানের কথা ঘোষণা করেন। ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে বঙ্গবন্ধু স্বাক্ষর করেন। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর হয়। প্রশাসনিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন, সংবিধান প্রণয়ন, এক কোটি মানুষের পুনর্বাসন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষাব্যবস্থার সম্প্রসারণ, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক স্কুল পর্যন্ত বিনামূল্যে এবং মাধ্যমিক শ্রেণী পর্যন্ত নামমাত্র মূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ, মদ, জুয়া ঘোড়দৌড়সহ সমস্ত ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড কার্যকরভাবে নিষিদ্ধকরণ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন, ১১,০০০ প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠাসহ ৪০,০০০ প্রাথমিক স্কুল সরকারিকরণ, মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীর হাতে ধর্ষিতা মেয়েদের পুনর্বাসনের জন্য নারী পুনর্বাসন সংস্থা, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন, ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মাফ, বিনামূল্যে/স্বল্পমূল্যে কৃষকদের মধ্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ, পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত ব্যাংক, বীমা ও ৫৮০টি শিল্প ইউনিটের জাতীয়করণ ও চালু করার মাধ্যমে হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থান, ঘোড়াশাল সার কারখানা, আশুগঞ্জ কমপ্লেক্সের প্রাথমিক কাজ ও অন্যান্য নতুন শিল্প স্থাপন, বন্ধ শিল্প কারখানা চালুকরণসহ অন্যান্য সমস্যার মোকাবেলা করে একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরি করে দেশকে ধীরে ধীরে একটি সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রয়াস চালানো হয়। অতি অল্প সময়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভ ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য।



❑ ১৯৭৩


নব প্রণীত সংবিধানের আলোকে, ৭ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ৩০০ টি আসনের মধ্যে ২৯৩ টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেন। ২৩ মে বিশ্ব শান্তিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ব শান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে “জুলিও কুরি” পুরস্কারে ভূষিত করে। ৩ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ঐক্যফ্রন্ট (যুক্তফ্রন্ট) গঠন করে। মার্চের নির্বাচনে জয়ী হয়ে নতুন মন্ত্রীসভা গঠন। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। ৬ সেপ্টেম্বর, মুজিব নিরপেক্ষ আন্দোলন (ন্যাম) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে আলজেরিয়ায় যাত্রা করেন। কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগদান এবং জাপান সফর করেন।



❑ ১৯৭৪ 


২২ শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ২৩শে ফেব্রুয়ারি লাহোরে ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর যোগদান। ২৫ সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। জাতিসংঘের অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় ভাষণ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্বের ১২৬ টি দেশের স্বীকৃতি। বাংলাদেশের ১৯ টি জেলার মধ্যে ১৭ টি জেলা বন্যায় প্লাবিত। শস্য বিনষ্ট ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে চরম খাদ্যসংকট। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সঙ্কটাপন্ন। ২৮ ডিসেম্বর দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা।


❑ ১৯৭৫


২৫ জানুয়ারি সংসদ রাষ্ট্রপতি শাসন পদ্ধতির ব্যবস্থা চালু করে। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ- রাষ্ট্রপতি ও মনসুর আলী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত। ২৪ ফেব্রুয়ারি সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) নামে সর্বদলীয় মঞ্চ গঠনের ডিক্রি জারি। এর লক্ষ্য ছিল জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করে সমাজের সর্বস্তরের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে দেশ গঠন। ৭ জুন বঙ্গবন্ধুকে চেয়ারম্যান করে বাকশাল কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ঘোষণা। ১৫ আগস্টের ভোরে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বাংলাদেশের স্থপতি বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ বাসভবনে সেনাবাহিনীর কতিপয় উচ্চাভিলাষী বিশ্বাসঘাতক অফিসারদের হাতে নিহত হন। সেদিন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী মহীয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন্নেছা, বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠপুত্র মুক্তিযোদ্ধা লে. শেখ কামাল, পুত্র লে. শেখ জামাল, কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল, দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, ভগ্নিপতি ও কৃষিমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও তার কন্যা বেবী সেরনিয়াবাত, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, দৌহিত্র সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবু, ভ্রাতুষ্পুত্র শহীদ সেরনিয়াবাত, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবনেতা সাংবাদিক শেখ ফজলুল হক মণি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব কর্নেল জামিল আহমেদ এবং ১৪ বছরের কিশোর আবদুল নঈম খান রিন্টুসহ ১৬ জনকে ঘাতকরা হত্যা করে। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান চিরনিদ্রায় শায়িত হন টুঙ্গিপাড়ায়। বাংলার মুক্তির নায়ক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন আর চিরতরে স্থান করে নিলেন বাঙ্গালির হৃদয়ে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মহামানব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শহীদ হবার পর দেশে সামরিক শাসন জারি হয়। গণতন্ত্রকে হত্যা করে মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। শুরু হয় হত্যা, খুন ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। কেড়ে নেয় জনগণের ভাত ও ভোটের অধিকার।


১৯৯৬ সালের ২৩ শে জুন মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ সরকার প্রধান হয়ে ক্ষমতায় আসার পরে ২ অক্টোবর জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ধানমন্ডি থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ১২ নভেম্বর, জাতীয় সংসদ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে। ১৯৯৭ সালের ১ মার্চ ঢাকা জেলা ও দায়রা জজের আদালতে পথচলা শুরু হয় বিচার কার্যের। ১৯৮৮ সালের ৮ ই নভেম্বর আদালতের বিচারক কাজী গোলাম রসুল ৭৬ পৃষ্ঠার রায় প্রদান করেন, যেখানে তিনি পনের অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ডে দন্ডিত করেন। ১৪ নভেম্বর ২০০০-এ, দুজন বিচারক পৃথক রায় দিয়েছিলেন। এরপরে বিষয়টি

হাইকোর্টের তৃতীয় বিচারকের কাছে প্রেরণ করা হয় যিনি অভিযুক্তদের বারোজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার পক্ষে সিদ্ধান্তমূলক রায় দেন। দোষী সাব্যস্ত পাঁচজন বন্দী আদালতের আপিল বিভাগে 'আপিলের ছুটি দায়ের করেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-জামায়াত জোট ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা কালে বিষয়টি কেস-তালিকা থেকে বাদ দেয়। অবশেষে ২০০৭ সালে এই মামলার শুনানির জন্য একটি বেঞ্চ গঠন করা হয়। ২০০৯ সালের ২৯ নভেম্বর শুনানির ২৯ দিন পর প্রধান বিচারপতির সাথে আপস করে বিচারিক বেঞ্চ এবং অন্য চার বিচারপতি আপিল প্রত্যাখ্যান করেন। এরপরে ২৭ জানুয়ারি চার বিচারক পুনর্বিবেচনার আবেদনটিও খারিজ করে দেন। পরের মধ্যরাতে, অর্থাৎ ২৮ শে জানুয়ারি, পাঁচজন ঘাতকের মধ্যে পাঁচজনকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। বিদেশে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় একজন ঘাতক মারা, গেছে, অন্য ছয় জন এখনও বিদেশে পলাতক। তবে খুনীদের বিচারের যে দাবি করা হয়েছিল তা অবশেষে মুজিব এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার চৌত্রিশ বছর পরে সমাধান করা হয়েছে। ১৫ই আগস্ট, ১৯৭৫ বাংলাদেশের ইতিহাসে কালোতম দিন। জাতি এটিকে জাতীয় শোক দিবস হিসাবে পালন করে।


❑ বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রন্থসমূহঃ 


* অসমাপ্ত আত্মজীবনী

প্রকাশকাল: জুন ২০১২

প্রকাশনী: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড

বিষয়বস্তু : শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত নিজের জীবনী লিখেছেন। এই গ্রন্থটি ইংরেজিসহ ১৩টি (সর্বশেষ ইতালীয় ভাষা, অনুবাদক আন্না কোক্কিয়ারেলা) ভাষায় অনূদিত হয়েছে (১লা মার্চ, ২০২১ পর্যন্ত)।


* কারাগারের রোজনামচা

প্রকাশকালঃ মার্চ ২০১৭

প্রকাশনীঃ বাংলা একাডেমি

বিষয়বস্তুঃ গ্রন্থটি ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে শেখ মুজিবুর

রহমানের কারাভোগের দিনলিপি। গ্রন্থটির নামকরণ করেন তার কনিষ্ঠা কন্যা শেখ রেহানা। এই গ্রন্থটি ইংরেজিসহ ২টি (সর্বশেষ অসমীয়া ভাষা, অনুবাদ সৌমেন ভারতীয়) অনূদিত হয়েছে


* আমার দেখা নয়াচীন

প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি ২০২০

প্রকাশনীঃ বাংলা একাডেমি

বিষয়বস্তুঃ ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে গণচীনের পিকিংয়ে অনুষ্ঠিত এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় শান্তি সম্মেলন উপলক্ষে শেখ মুজিবের চীন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত।


❑  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উল্লেখযোগ্য ১০টি উক্তি:


১. এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম!


২. আমার সবচেয়ে বড় শক্তি আমার দেশের মানুষকে ভালবাসি, সবচেয়ে বড় দূর্বলতা আমি তাদেরকে খুব বেশী ভালবাসি।


৩. প্রধানমন্ত্রী হবার কোন ইচ্ছা আমার নেই। প্রধানমন্ত্রী আসে এবং যায়। কিন্তু, যে ভালোবাসা ও সম্মান দেশবাসী আমাকে দিয়েছেন, তা আমি সারাজীবন মনে রাখবো।


৪. সাম্প্রদায়িকতা যেন মাথাচারা দিয়ে উঠতে না পারে। ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র বাংলাদেশ। মুসলমান তার ধর্মকর্ম করবে। হিন্দু তার ধর্মকর্ম করবে । বৌদ্ধ তার ধর্মকর্ম করবে। কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না।


৫. সাত কোটি বাঙ্গালির ভালোবাসার কাঙ্গাল আমি। আমি সব হারাতে পারি, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা হারাতে পারব না।


৬. এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না খায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এদেশের মানুষ, যারা আমার যুবক শ্রেণী আছে তারা চাকরি না পায় বা কাজ না পায়।


৭. ভিক্ষুক জাতির ইজ্জত থাকে না। বিদেশ থেকে ভিক্ষা করে এনে দেশকে গড়া যাবে না। দেশের মধ্যেই পয়সা করতে হবে।


৮. সরকারী কর্মচারীদের জনগণের সাথে মিশে যেতে হবে। তারা জনগণের খাদেম, সেবক, ভাই। তারা জনগণের বাপ, জনগণের ছেলে, জনগণের সন্তান। তাদের এই মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে।


৯. সমস্ত সরকারী কর্মচারীকেই আমি অনুরোধ করি, যাদের অর্থে আমাদের সংসার চলে তাদের সেবা করুন।



১০. বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীর বিচার হবেই।


❑  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে উল্লেখযোগ্য উক্তি

❖ ইন্দিরা গান্ধী (গণপ্রজাতন্ত্রী ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী): শেখ মুজিব নিহত হওয়ার খবরে আমি মর্মাহত। তিনি একজন মহান নেতা ছিলেন। তাঁর অনন্য সাধারণ সাহসিকতা এশিয়া ও আফ্রিকার  জনগণের জন্য প্রেরণাদায়ক ছিল।


❖ ফিদেল ক্যাস্ত্রো (গণপ্রজাতন্ত্রী কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং কিংবদন্তি বিপ্লবী): আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতায় তিনি হিমালয়ের মতো।


❖ অন্নদাশঙ্কর রায় (বাঙালি কবি এবং প্রাবন্ধিক): যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরি মেঘনা বহমান ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।


 ❖ নরেন্দ্র মোদি (গণপ্রজাতন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী): বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গণতন্ত্রের প্রতিমূর্তি, এক বিশাল ব্যক্তিত্ব এবং ভারতের এক মহান বন্ধু।


❖ মোহাম্মদ হাসনাইন হাইকল (প্রখ্যাত মিশরীয় সাংবাদিক): বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু বাংলাদেশের সম্পত্তি নন। তিনি সমগ্র বাঙালির মুক্তির অগ্রদূত।


❖ ইয়াসির আরাফাত (ফিলিস্তান মুক্তি মোর্চার সাবেক নেতা নোবেল বিজয়ী): আপোষহীন সংগ্রামী নেতৃত্ব এবং কুসুমকোমল হৃদয় ছিল মুজিবের চরিত্রের বিশেষত্ব ।



Post a Comment

0 Comments