এই পর্বে(দ্বিতীয়) আমরা বঙ্গবন্ধুর জীবনের ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ কথা গুলো জানবো।
❑১৯৪৭
কলকাতায় ফিরে অধ্যক্ষ জুবেরীর বিশেষ অনুমতি নিয়ে মাস কয়েক পড়ে বি.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ পাঠ্যবিষয় ছিল ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান। ৬ই এবং ৭ই জুলাই সিলেটে অনুষ্ঠিত গণভোটে মুসলিম লীগের বিজয়ের পেছনে শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ ভূমিকা ছিল। তখন তিনি পাঁচশত মুসলিম লীগ কর্মীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ রাজ কর্তৃক ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পাশাপাশি বাংলা ও পাঞ্জাব বিভক্তির ঘোষণা। বাংলার মুসলিম লীগ নেতারা অবিভক্ত বঙ্গের পক্ষে আন্দোলন শুরু করলে মুজিব সভা-সমাবেশে বক্তৃতা করেন। সিলেটকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার গণভোটে কর্মীদল নিয়ে সিলেট যান মুজিব। করিমগঞ্জের জনসভায় সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে বক্তৃতা। বাংলার মুসলিম লীগ সংসদীয় দলের নেতা সোহরাওয়ার্দীকে বঞ্চিত করে নাজিমুদ্দীনকে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত। ভারত বিভাগ এবং পাকিস্তানের জন্মের পরিপ্রেক্ষিতে যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়েছিল, তখন তিনি মুসলমানদের রক্ষায় এবং সহিংসতা দমনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য কাজ করেন মুজিব। ঈদের দিনে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাত। দেশবিভাগের পর কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় ১৫০ মোগলটুলীতে লীগ অফিসে রাজনীতি শুরু। ২৮ সেপ্টেম্বর মুজিবের প্রথম সন্তান শেখ হাসিনার জন্ম। অক্টোবরে ঢাকায় শামসুল হক, আতাউর রহমান খান, কামরুদ্দিন প্রমুখকে নিয়ে গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠন। বরিশালে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আহবানে জনসভায় সোহরাওয়ার্দী, প্রফুল্লচন্দ্র প্রমুখের সঙ্গে মুজিবের অংশগ্রহণ। আইন পড়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি। একই সঙ্গে মাসে ৩০০ টাকা বেতনে কলকাতার 'ইত্তেহাদ' পত্রিকার পূর্ব বাংলার প্রতিনিধির দায়িত্ব।
❑১৯৪৮
‘নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ সরকারের গণবিরোধী ভূমিকার বিরোধিতা করলে তিনি নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ত্যাগ করেন । ৪ঠা জানুয়ারি গঠন করেন ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ তিনি ছিলেন এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও নইমউদ্দিন আহ্বায়ক। নবগঠিত এ দলের ১০ দফা দাবির অন্যতম ছিল বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করা, সামরিক বাহিনীতে জনসংখ্যার অনুপাতে বাঙালিদের নিয়োগ, বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষা, পাকিস্তানের নৌবাহিনীর সদর দফতর চট্টগ্রামে স্থানান্তর প্রভৃতি। ২৩শে ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষারূপে ঘোষণা দিলে দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় ওঠে এবং রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়। ২রা মার্চ গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এ আন্দোলনে প্রথম সারির একজন। ১১ই মার্চ হরতাল পালিত হয়। ইডেন বিল্ডিং, জিপিও প্রভৃতি স্থানে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ হয় এবং সচিবালয়ের সামনে শামসুল হক, অলি আহাদ ও শেখ মুজিবুর রহমানসহ প্রায় শ'খানেক গ্রেফতার হয় এবং ঢাকা জেলে বন্দি হয়।
প্রবল ছাত্র আন্দোলনের মুখে ১৫ই মার্চ তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৬ই মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ছাত্রসভায় সভাপতিত্ব করেন।
১৯শে মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১১ই সেপ্টেম্বর তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়।
❑ ১৯৪৯
শেখ মুজিবকে আহ্বায়ক করে জুলুম প্রতিরোধ দিবস পালন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে সভা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মচারী ও ছাত্র ধর্মঘট। রাতে
বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা ২৪ ঘন্টার মধ্যে ছাত্রদের হল ত্যাগের নির্দেশ। মুজিবের নেতৃত্বে সলিমুল্লাহ হলে ছাত্রদের হল ত্যাগে অস্বীকৃতি। মাসখানেকের
মধ্যে মুজিবসহ ২৭ জন ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার। বন্ড ও জরিমানা দিয়ে ছাত্রত্ব ফিরিয়ে নিতে মুজিবের অস্বীকৃতি। ছাত্র ধর্মঘট আহবান। ১৮ মার্চ আইন বিভাগে অবস্থান ধর্মঘট। বিকেলে শেখ মুজিবসহ ছাত্রদের উপাচার্য ভবনের নিচতলা দখল। পরদিন মুজিবসহ ৯ নেতা গ্রেফতার। ২৩ শে জুন ঢাকার রোজগার্ডেনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। ভাসানী সভাপতি এবং শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক, কারাবন্দি অবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমান এর যুগ্ম-সম্পাদক নিযুক্ত হন এবং জুন মাসের শেষ দিকে কারামুক্তি এবং গোপালগঞ্জ গমন। সেখানে জনসমাবেশের উপর ১৪৪ ধারা জারি হলে মসজিদ প্রাঙ্গনে সভা। মসজিদের মধ্যেও ১৪৪ ধারা জারি ও তাঁকে গ্রেফতার। জনতা কর্তৃক লাঠি বৈঠা নিয়ে মসজিদ ঘেরাও। জনগণকে শান্ত করে মুজিবের অদুরবর্তী আদালতে গমন এবং রাতে জামিন। আরমানিটোলা ময়দানে আওয়ামী মুসলিম লীগের জনসভা ভাসানীর সভাপতিত্বে শেখ মুজিবের বক্তৃতা। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলীর ঢাকা সফরকালে দুর্ভিক্ষাবস্থার প্রতিবাদে আরমানিটোলায় জনসভা ও ভুখা মিছিল। মিছিলে পুলিশের লাঠি চার্জ ও টিয়ার গ্যাস মুজিব লাঠির আঘাতে অজ্ঞান। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় মোগলটুলী অফিসে আশ্রয়। অফিসে পুলিশি হামলা। তিনতলা থেকে লাফিয়ে পার্শ্ববর্তী দোতলা ভবন দিয়ে প্রথমে মৌলভীবাজারে ও পরদিন মোগলটুলীতে আত্মগোপন গোয়েন্দা বিভাগের লোকেরা বাড়ি ঘেরাও করলে মুজিবের আত্মগোপন এবং ইয়ার মোহাম্মদের বাড়িতে ভাসানীর সঙ্গে সাক্ষাত। পুলিশের চোখ এড়িয়ে ঢাকা থেকে স্থলপথে ভারত হয়ে লাহোর গমন। ইফতিখার উদ্দিনের বাসায় অতিথি। নবাব মামদোতের বাসায় সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সাক্ষাৎ। সীমান্ত প্রদেশ আওয়ামী মুসলিম লীগের সভায় সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে একটি জাতীয় রাজনৈতিক দল গঠনে মুজিবের প্রস্তাব। একমাস পর বিমানে লাহোর থেকে দিল্লী হয়ে ট্রেনে কলকাতা। রানাঘাট ও যশোরে গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কুলির ছদ্মবেশে জাহাজঘাটা দিয়ে খুলনায় প্রবেশ। পরদিন সাহেবী পোশাকে ছদ্মবেশে জাহাজ ছাড়ার পূর্ব মুহুর্তে জাহাজে উঠে গোপালগঞ্জ। সপ্তাহখানেক পরে ঢাকার পথে যাত্রা। গ্রেফতার এড়ানোর জন্য সপরিবারে হাঁটাপথ, নৌকা, লঞ্চ ও ফেরি ধরে মুন্সিগঞ্জ হয়ে নারায়ণগঞ্জ পৌঁছে ট্যাক্সিযোগে মোগলটুলী গমন। ডিসেম্বরে খাজা দেওয়ানের বাসা থেকে নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার ও ঢাকা জেলে বন্দি।
❑১৯৫০
১লা জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের ঢাকায় আগমনকালে আওয়ামী মুসলিম লীগ এক ভুখা মিছিল বের করে। পাকিস্তানি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করায় এবং রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে সোচ্চার হওয়ার জন্য পাকিস্তান সরকারের দমননীতির অংশ হিসেবে ১১ই মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। সেবার তাকে প্রায় দুই বছর জেলে আটক রাখা হয়েছিল।
❑ ১৯৫১
ডিটেনশন অর্ডার ছাড়াই খুলনা জেলে আটকে রাখলে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি। গোপালগঞ্জে প্রেরণ ও জামিন লাভ। মুক্তি উপলক্ষে শেখ মুজিবকে নিয়ে বিরাট শোভাযাত্রা। বাড়ি রওনা দেওয়ার আগেই পুনরায় গ্রেফতার। মামলার জন্য ফরিদপুর গোপালগঞ্জ যাতায়াত। স্বাস্থ্যের অবনতি।
❑১৯৫২
২৭ জানুয়ারির এক জনসভায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন যে ‘উর্দু হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা'। ছাত্র, যুবকর্মী ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা ১৯৪৮ সালে যেমন প্রতিবাদ করেছিলেন তেমনি তৎক্ষণাত প্রতিবাদ করে। যদিও ১৯৪৯ সালের অক্টোবরের পর থেকে মুজিবকে কারাগারে আটকানো হয়েছিল, তিনি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় নেতাকর্মীদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছিলেন এবং তাদের মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত করেন যে একটি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি ফেব্রুয়ারিকে ২১শে ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস' হিসাবে পালন করতে উৎসাহিত করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন যে তিনি পাবলিক সার্ভিস আইনের আওতায় বিনা অভিযোগে কারাগারে বন্দী হওয়ার প্রতিবাদে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের অনশন কর্মসূচিতে যাওয়ার জন্য তিনি দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। ঢাকা মেডিকেলে বন্দি অবস্থায় কর্মীদের সঙ্গে আন্দোলন নিয়ে শেখ মুজিবের আলোচনা। এর পরেই ১৪ ফেব্রুয়ারি কর্তৃপক্ষ তাকে ঢাকা কারাগার থেকে সরিয়ে ফরিদপুর কারাগারে প্রেরণ করে। শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিন আহমেদের আমরণ অনশন। টিউব দিয়ে জোর করে খাওয়ানোর ফলে মুজিবের নাকে ঘা ও রক্তপাত। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে শারীরিক অবস্থার ভীষণ অবনতি। ইতোমধ্যে ঢাকায় ২১ ফেব্রুয়ারির গুলিবর্ষণের ঘটনা। ২৮ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবের মুক্তিলাভ।
আওয়ামী মুসলিম লীগের কার্যক্রমে সক্রিয়। শেখ মুজিবের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ। মে মাসে করাচী সফর। প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দীনের সঙ্গে সাক্ষাৎ। রাজবন্দিদের মুক্তি এবং ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি। করাচীতে সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিসহ পূর্ববাংলার বিভিন্ন দাবি ব্যাখ্যা। হায়দ্রাবাদ গিয়ে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সাক্ষাৎ। সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে লাহোরে সংবাদ সম্মেলন। ঢাকায় প্রত্যাবর্তন। জুন-আগস্টে পূর্ব বাংলার বিভিন্ন জেলায় জনসভা ও কর্মীসভা। আতাউর রহমান খান, মানিক মিয়াসহ পিকিং-এ বিশ্বশাস্তি সম্মেলনে যোগদান। সম্মেলনে শেখ মুজিব কর্তৃক বাংলায় ভাষণ । বছরের শেষ দিকে সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে পূর্ব বাংলার জেলায় জেলায় জনসভা।
❑১৯৫৩
৯ জুলাই মুজিব কাউন্সিলের সভায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পূর্ব বাংলার সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে সোহরাওয়ার্দী, ফজলুল হক ও ভাসানীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠন। দেশব্যাপী মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচারণা। ৪ই ডিসেম্বর যুক্তফ্রন্ট গঠন।
❑১৯৫৪
মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া এলাকা থেকে বিপুল ভোটে পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মুসলিম লীগের প্রার্থী প্রভাবশালী নেতা ওয়াহিদুজ্জামান। যুক্তফ্রন্ট মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ২৩৭ টি আসনের মধ্যে ২২৩ টি আসন লাভ করে যার মধ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগ পায় ১৪৩ টি এবং মুসলিম লীগ মাত্র ৯ টি আসন লাভ করে।
ফজলুল হকের মুখ্যমন্ত্রীত্বে মে মাসে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা। শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রীত্ব গ্রহণ। ১৪ই মে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার কৃষি, বন, সমবায় ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। শপথ গ্রহণের দিনেই আদমজী পাটকল এলাকায় ভয়াবহ দাঙ্গা। শেখ মুজিব দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকায় যান এবং শাস্তি স্থাপন ও উদ্ধার তৎপরতায় নেতৃত্ব দেন। রাতে ঢাকা শহরে বাঙালি ও অবাঙ্গালিদের সম্ভাব্য দাঙ্গা এড়াতে শেখ মুজিবের পথসভা। হাসিনা ও কামালকে নিয়ে মিন্টো রোডের বাসভবনে বসবাস। ফজলুল হকের নেতৃত্বে করাচী গমন। গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের সঙ্গে সাক্ষাৎ। প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী (বগুড়া)-র সঙ্গে তর্ক। সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সাক্ষাৎ।
২৯শে মে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ৯২-ক ধারা প্রয়োগ করে মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দিয়ে গভর্নরের শাসন প্রবর্তন করার পর ৩০শে মে তাঁকে বন্দি করা হয়। ইস্কান্দার মির্জা পূর্ব বাংলার গভর্নর নিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী কর্তৃক শেরে বাংলাকে রাষ্ট্রদ্রোহী' ও শেখ মুজিবকে 'দাঙ্গাকারী' ঘোষণা। মুজিবের নামে ডাকাতি, খুন ও লুটতরাজের অভিযোগে মামলা। ২৩ অক্টোবর পাকিস্তানের গণপরিষদ বাতিল। সিয়াটো ও সেনটো চুক্তিতে স্বাক্ষ গ্রেফতারের পূর্বে শেখ মুজিব এর প্রতিবাদে বিবৃতি দেন। মুজিবের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা আইনের মামলা মিথ্যা প্রমাণিত। ইতোমধ্যে সোহরাওয়ার্দীর পাকিস্তানের আইনমন্ত্রীর পদলাভ। ২৩ শে ডিসেম্বর মুজিব মুক্তি পেয়ে করাচীতে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
❑১৯৫৫
মে মাসে ৯২ক ধারা প্রত্যাহার। মুজিব ৫ জুন গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৭ জুন পল্টন ময়দানে আওয়ামী লীগ একটি জনসভা করে। পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে একুশ দফা কর্মসূচি পেশ করা হয়েছিল। ২৩ শে জুন, আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে পূর্ব পাকিস্তানে স্বায়ত্তশাসন মঞ্জুর না করা হলে বিধানসভার আওয়ামী লীগ সদস্যরা পদত্যাগ করবেন। পাকিস্তান গণপরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে শেখ মুজিবসহ ১২ জন নির্বাচিত। আবু হোসেন সরকার কর্তৃক পূর্ব বাংলায় নতুন মন্ত্রিসভা গঠন। কেন্দ্রে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভায় শেরে বাংলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ গ্রহণ। সোহরাওয়ার্দী আইন মন্ত্রীর পদ ত্যাগ করে বিরোধী দলের আসনে। গণপরিষদের বিভিন্ন অধিবেশনে শেখ মুজিব পূর্ব বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তান নামকরণের বিরোধীতা, প্রদেশসমূহের পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন, বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা, গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতা প্রভৃতি দাবিতে বক্তৃতা করেন। ২১ শে অক্টোবরে ঢাকায় দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে সংগঠনের ‘মুসলিম' শব্দ বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ' নামকরণ। পাকিস্তানে চলমান সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। মওলানা ভাসানী সভাপতি ও শেখ মুজিব সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত।
❑১৯৫৬
৩ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের নেতারা মুখ্যমন্ত্রীর সাথে বৈঠককালে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টিকে খসড়া সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। ১৪ জুলাই এক সভায় আওয়ামী লীগ প্রশাসনে সামরিক প্রতিনিধির বিরোধিতা করে একটি প্রস্তাব গৃহীত করে। প্রস্তাবটি মুজিব কতৃর্ক সরানো হয়েছিল। ৪ সেপ্টেম্বর ১৪৪ ধারা অমান্য করে মুজিবের নেতৃত্বে দুর্ভিক্ষবিরোধী মিছিল বের করা হয়। চক বাজার এলাকায় পুলিশ মিছিলে গুলি চালালে কমপক্ষে তিনজন নিহত হয়। ১৬ সেপ্টেম্বর, তিনি জোট সরকারের শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতি দমন ও গ্রাম-সহায়তা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
❑১৯৫৭
ফেব্রুয়ারি মাসে কাগমারীতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের অধিবেশনে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র নীতি ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে তীব্র মতবিরোধ।মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন। ৩০ শে মে শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের জন্য মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ২৪শে জুন থেকে ১৩ই জুলাই পর্যন্ত শেখ মুজিবের চীন সফর এবং মাও সেতুং ও চৌ-এন-লাইয়ের সঙ্গে বৈঠক।
❑১৯৫৮
৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জা কর্তৃক শাসনতন্ত্র বাতিল করে মন্ত্রিসভা সমূহ ভেঙ্গে দিয়ে সামরিক শাসন জারি জেনারেল আইয়ুব খান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। ১১ই অক্টোবর মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর মাসহ পূর্ব বাংলার বহু নেতাকে গ্রেফতার এবং একের পর এক মিথ্যা মামলা দায়ের করে হয়রানি করা হয়। প্রায় চৌদ্দ মাস জেলখানায় থাকার পর তাঁকে মুক্তি দিয়ে পুনরায় জেলগেটেই গ্রেফতার করা হয়। ২৭ অক্টোবর ইস্কান্দার মীর্জাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে আইয়ুব খানের সর্বময় ক্ষমতা গ্রহণ।
❑১৯৫৯
শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের পূর্ব বাংলার ৪৩ জন নেতাকে 'এবডো' বিধিতে নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা। ১০ ডিসেম্বর প্রতারণা মামলায় শেখ মুজিব খালাস। মুক্তি দিয়ে জেলগেট থেকে গ্রেফতার। হাইকোর্টে রিট আবেদন করে মুক্তিলাভ। আইয়ুব খান কর্তৃক মৌলিক গণতন্ত্র প্রবর্তনের ঘোষণা, যার মাধ্যমে সর্বজনীন ভোটাধিকার রহিত হয়।
❑১৯৬০
সেগুনবাগিচার বাসাকে কেন্দ্র করে নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ। সামরিক শাসন ও আইয়ুববিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু গোপন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। হোটেল শাহবাগে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে আলোচনা। মার্চে আলফা ইনসিওরেন্স এর কন্ট্রোলারের দায়িত্ব গ্রহণ। মুজিবের চট্টগ্রাম সফর। শেখ মুজিব ও তার ভাই শেখ নাসেরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের। ৩১ মে মামলা রায়ে অভিযুক্তরা বেকসুর খালাস। তবে বিনা অনুমতিতে তার ঢাকা ত্যাগ এর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি। সেপ্টেম্বর এ ক্ষমতা অপব্যবহারের মামলায় শেখ মুজিব ও শেখ নাসেরকে ২ বছর কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা।
❑১৯৬১
হাইকোর্ট কর্তৃক আটকাদেশ অবৈধ ঘোষণা করার পর শেখ মুজিবুর রহমান কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন। এ সময়ই শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্যে কাজ করার জন্য উদ্যমী ছাত্র নেতৃবৃন্দদের নিয়ে 'স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ' নামে একটি গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
❑১৯৬২
জননিরাপত্তা আইনে ৩০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী এবং ৬ ফেব্রুয়ারি মুজিব গ্রেফতার। ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা। ২ জুন চার বছরের সামরিক শাসনের অবসান ঘটলে ১৮ জুন শেখ মুজিবের মুক্তি লাভ। এক সপ্তাহের মধ্যে মুজিবসহ ৮ নেতার মৌলিক গণতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করে নতুন শাসনতন্ত্র প্রণয়নের দাবিতে যুক্তবিবৃতি৷ দু'সপ্তাহ পরে পল্টনের জনসভায় মুজিবসহ নেতৃবৃন্দের ভাষণ। শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ রদে আন্দোলনরত ছাত্রদের মিছিলে গুলি। প্রতিবাদে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মুজিব, আতাউর রহমান খান এর বিবৃতি। ৪ অক্টোবর লাহোরে আওয়ামী লীগ সহ ৬ টি রাজনৈতিক দলের জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এন.ডি.এফ) গঠন। অক্টোবর মাসে গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে সারা বাংলা সফর করেন।
❑১৯৬৩
সোহরাওয়ার্দী অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থানকালে বঙ্গবন্ধু তাঁর সঙ্গে পরামর্শের জন্য আগষ্টে লন্ডন যান। ৫ ডিসেম্বর বৈরুতে সোহরাওয়ার্দীর রহস্যজনক মৃত্যু।
❑ ১৯৬৪
জানুয়ারিতে খুলনা ও ঢাকা সহ বিভিন্ন স্থানে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ও উদ্বাস্তু বিহারিদের হিংসাত্মক আক্রমণ। শেখ মুজিব কে আহবায়ক করে দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠন। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে মুজিবের নেতৃত্বে দাঙ্গা প্রতিরোধ। 'পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও' প্রচারপত্র বিলির পর শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দিন আহমেদ গ্রেফতার ও পরে জামিন এ মুক্তি। ২৫ জানুয়ারি শেখ মুজিবের ধানমন্ডির বাসভবনে নেতৃবৃন্দের সভায় আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবনের সিদ্ধান্ত। জনগণের অনুভূতির প্রতিক্রিয়া হিসাবে প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের দাবিতে বৈঠকে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। সভায় মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশকে দলীয় সভাপতি ও মুজিবকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করেন। সর্বজনীন ভোটাধিকার রক্ষার দাবিতে ১৮-১৯ মার্চ “দাবি দিবস”। নেতৃবৃন্দ গ্রেফতার। ১৯ মার্চ ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে হরতাল। বিকেলে পল্টন ময়দানে আওয়ামী লীগ ও ন্যাপের জনসভায় ভাসানী ও শেখ মুজিবের ভাষণ। ৩১ মে জন নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার ; পরে জামিনে মুক্তি। ১২ জুলাই জুলুম প্রতিরোধ দিবস পালন। পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে তৎপরতা। কনভেনশন মুসলিমলীগ থেকে আইয়ুব খান ও বিরোধীদল থেকে ফাতেমা জিন্নাহ প্রার্থী। নভেম্বর এ মুজিব এর করাচী গমন ও ফাতেমা জিন্নাহর সঙ্গে বৈঠক।
ডিসেম্বরের প্রথম সন্ধ্যায় জননিরাপত্তা আইনে শেখ মুজিবকে গ্রেফতার; পরে জামিনে মুক্তি।
❑ ১৯৬৫
মৌলিক গণতন্ত্রীদের ভোটে আইয়ুব খানের জয়। মার্চ এ জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সহ ২১ জন বিরোধী ও স্বতন্ত্র সদস্যের জয়। মে মাসে প্রাদেশিক নির্বাচনে সরকারি দল ৬৮, বিরোধী দল ২৩ ও স্বতন্ত্রের ৫৮ আসন লাভ। জুলাই মাসে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে 'রাষ্ট্রদ্রোহিতা'র মামলা দায়ের । তাকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরে উচ্চ আদালতের আদেশে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। সেপ্টেম্বরে ১৭ দিনের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান ছিল অরক্ষিত। ঢাকার গভর্নর-হাউসে সর্বদলীয় সভায় শেখ মুজিব কর্তৃক পূর্বাংশকে অরক্ষিত রাখার তীব্র সমালোচনা।
❑ ১৯৬৬
রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও জননিরাপত্তা আইনে ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। হাইকোর্টে জামিন লাভ। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে লাহোরে বিরোধী দলের জাতীয় সম্মেলন। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ থেকে তর্কবাগীশ, শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীনসহ ১০ নেতা যোগ দেন। ৫ই ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৬ দফা উত্থাপন। সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র ছাড়া সকল ক্ষমতা প্রদেশের; পূর্ব ও পশ্চিমাংশের জন্য পৃথক মুদ্রা; প্রদেশের রাজস্ব ও কর আদায়ের ক্ষমতা; প্রদেশের পৃথক বৈদেশিক বাণিজ্য চালানো ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের অধিকার এবং প্রদেশের আঞ্চলিক সেনাবাহিনী বা আধা-সামরিক বাহিনী গঠনের ক্ষমতা এগুলো ছিল ৬ দফা দাবি। ফেব্রুয়ারির মধ্যেই পূর্ব বাংলার - জেলায় জেলায় ৬-দফার পক্ষে ব্যাপক জনমত গড়ে উঠে। মার্চে ঢাকার ইডেন হোটেলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ৬ দফাকে আওয়ামী লীগের মূল কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ। কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমানকে সভাপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ও তাজউদ্দীন আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা। শেখ মুজিব ৬ দফার পক্ষে জনসভা শুরু করেন। প্রথমে খুলনা থেকে ফেরার পথে যশোরে গ্রেফতার ও জামিন। পরে ৮ মে নারায়ণগঞ্জ থেকে ফেরার পথে গ্রেফতার। দেশরক্ষা আইনে ৩ মাসের আটকাদেশ দিয়ে ঢাকা জেলে বন্দি। ৭ জুন ব্যাপক হরতালে সারাদেশে মনুমিয়া সহ ১১ জন শহীদ পুরাতন মামলায় খালাস পেলেও মুজিবের বিরুদ্ধে সরকারের নতুন নতুন মামলা।
❑ ১৯৬৭
আওয়ামী লীগের মূল নেতৃত্ব ও কর্মীবাহিনীর আন্দোলন। ইতোপূর্বে আপত্তিকর ভাষণের দায়ে শেখ মুজিবকে ১ মাসের কারাদণ্ড।
❑ ১৯৬৮
৩ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামি করে মোট ৩৫ জন বাঙালি সেনা ও সিএসপি অফিসারের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ এনে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসাবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। ১৭ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে পুনরায় জেলগেট থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে আটক রাখা হয়। বঙ্গবন্ধুসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্ত আসামিদের মুক্তির দাবিতে সারা দেশে বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯ জুন ঢাকা সেনানিবাসে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামিদের বিচারকার্য শুরু হয়।
❑ ১৯৬৯
৫ জানুয়ারি ৬ দফাসহ ১১ আদায়ের লক্ষ্যে ডাকসু সহ-সভাপতি তোফায়েল আহমেদ এর নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন আওয়ামী লীগসহ ৮ টি রাজনৈতিক দলের জোট গঠন। ১৮ জানুয়ারি থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মিছিল। ২০ তারিখে আমাদের এবং ২৪ তারিখে পুলিশের গুলিতে মতিউরের মৃত্যু। আন্দোলন 'গণ অভ্যুত্থানে' রূপান্তরিত। ২৫ জানুয়ারি থেকে ঢাকায় কারফিউ জারি। শেখ মুজিবের মুক্তি ও আগরতলা মামলা প্রত্যাহার দাবিতে সারাদেশ উত্তাল। ১৫ ফেব্রুয়ারি মামলায় অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হককে বন্দি অবস্থায় হত্যা। পরদিন বিক্ষুব্দ জনতার মন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিনের বাড়িতে অগ্নি সংযোগ। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা পুলিশের গুলিতে শহীদ হলে পরিস্থিতি বিস্ফোরনোম্মুখ হয়। অনিবার্য পতনের মুখে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কে গোলটেবিল বৈঠকে আহবান। শেখ মুজিব কে বন্দি রেখে বৈঠকে যোগদানে আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দের অস্বীকৃতি। শেখ মুজিব ও প্যারোলে বৈঠকে যোগ দিতে রাজি হননি। পর্যুদস্তু সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে কারফিউ প্রত্যাহার করে এবং পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিব সহ সকল বন্দি কে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১০ লক্ষ লোকের সমাবেশে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ শেখ মুজিবুর রহমান কে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করে। ১০ মার্চ বঙ্গবন্ধু রাওয়ালপিন্ডিতে আইয়ুব খানের গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করেন। বঙ্গবন্ধু গোলটেবিল বৈঠকে আওয়ামী লীগের ৬ দফা ও ছাত্র সমাজের ১১ দফা দাবি উপস্থাপন করে বলেন, 'গণঅসন্তোষ নিরসনে ৬ দফা ও ১১ দফার ভিত্তিতে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই'। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ও রাজনীতিবিদরা বঙ্গবন্ধুর দাবি অগ্রাহ্য করলে ১৩ মার্চ তিনি গোলটেবিল বৈঠক ত্যাগ করেন এবং ১৪ মার্চ ঢাকায় ফিরে আসেন। পূর্ব বাংলায় হরতালসহ আন্দোলন। ২৫ মার্চ আইয়ুব খানের পদত্যাগ। সামরিক শাসন জারি। সেনাপ্রধান ইয়াহিয়ার সর্বময় ক্ষমতা গ্রহণ। ২৫ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু তিন সপ্তাহের সাংগঠনিক সফরে লন্ডন গমন করেন। ৫ ডিসেম্বর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন বাংলাদেশ। তিনি বলেন, “একসময় এদেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে বাংলা কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকুও চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে। ...একমাত্র ‘বঙ্গোপসাগর’ ছাড়া আর কোন কিছুর নামের সঙ্গে বাংলা কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। ...জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি- আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম পূর্ব পাকিস্তান-এর পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’ ।
❑ ১৯৭০
৬ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পুনরায় আওয়ামী লীগ সভাপতি নির্বাচিত হন। ১ এপ্রিল আওয়ামী লীগ কার্যকরী পরিষদের সভায় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ৭ জুন রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু ৬ দফার প্রশ্নে আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। ১৭ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু তার দলের নির্বাচনী প্রতীক হিসাবে নৌকা প্রতীক পছন্দ করেন এবং ঢাকার ধোলাইখালে প্রথম নির্বাচনী জনসভার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। ২৮ অক্টোবর তিনি জাতির উদ্দেশ্যে বেতারটিভি ভাষণে ৬ দফা বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের জয়যুক্ত করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। ১২ই নভেম্বরের গোর্কিতে উপকূলীয় এলাকায় ১০ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটলে বঙ্গবন্ধু নির্বাচনী প্রচারণা বাতিল করে দুর্গত এলাকায় চলে যান এবং আর্তমানবতার প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের ঔদাসীন্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তিনি গোর্কিতে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের ত্রাণের জন্য বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানান। ৭ই ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। সাধারণ নির্বাচন ও পরে অনুষ্ঠিত উপকূল অঞ্চলের নির্বাচনসহ নৌকা প্রতীক নিয়ে ৩০০ সাধারণ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ১৬৭ আসন লাভ। প্রাদেশিক পরিষদের ২৯৮ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৮৮ আসন লাভ।

0 Comments