বাংলা ব্যাকরণের কিছু জটিল সমস্যার সমাধান

 





জটিলতম প্রশ্নের ব্যাখ্যামূলক সমাধানঃ


১. দ্বৈপায়ন শব্দের সন্ধি বিচ্ছেদ কোনটি?


ক. দ্বীপ+ অয়ন 

খ. দ্বীপ+ ষ্ণ্য

গ. দৈব+ আয়ন

ঘ. দ্বীপ+ আয়ন


ব্যাখ্যা : এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে অনেক মতবিরোধ দেখা যায়। প্রথম কথা হচ্ছে, 'দ্বৈপায়ন’ মূলত সন্ধি বিচ্ছেদ না এটি প্রত্যয়ঘঠিত শব্দ। কারণ, সন্ধি বিচ্ছেদে শব্দের আদিস্বরের পরিবর্তন হয় না কিন্তু প্রত্যয়ে গুণ বৃদ্ধির নিয়মে আদিস্বরের পরিবর্তন ঘটে। যেমন- শারদীয় (শরৎ+ঈয়), বাহুল্য (বহুল+য), দৈব (দেব+ ষ্ণ)। তবে অনেক প্রত্যয়ঘটিত শব্দও পরীক্ষায় সন্ধি বিচ্ছেদে আসে।


সংস্কৃত 'অয়ন’ ও ‘আয়ন' দিয়ে দুটি প্রত্যয় আছে। 'অয়ন' প্রত্যয় দিয়ে গঠিত শব্দে সাধারণত আদি স্বরের পরিবর্তন হয় না। যেমন- নগরায়ন, রামায়ন, নারায়ন (নার+অয়ন)।

কিন্তু ‘আয়ন’ প্রত্যয়ঘটিত শব্দে আদি স্বরের পরিবর্তন হয়। যেমন- বাৎস্যায়ন। 'দ্বৈপায়ন' শব্দের বিশ্লেষণে অভিধানে দেওয়া আছে ‘দ্বীপ+অয়ন+অ'- এই থেকেই বিতর্ক শুরু। যেহেতু শব্দের আদিম্বরের পরিবর্তন হয়েছে, তাই 'দ্বীপ+আয়ন' অর্থাৎ (ঘ) অপশনটিই অধিক যুক্তিযুক্ত।


২. ধ্বনি পরিবর্তন কয় প্রকার?


ক. ২

খ. ৩

গ. ৪

ঘ. ৫ 

ব্যাখ্যা : অনেকেই উত্তর করবে ধ্বনি পরিবর্তন দুই প্রকার (স্বরধ্বনি ব্যঞ্জনধ্বনি) কিন্তু উত্তরটি ঠিক নয়। মূলত ধ্বনি পরিবর্তন চার প্রকার। 

যথা-

ক. ধ্বনির আগম: শব্দে স্বরধ্বনি বা ব্যঞ্জনধ্বনির যে অতিরিক্ত আগমন ঘটে, তাকে ধ্বনির আগম বলে। যেমন- আজ > আইজ, দিশ> দিশা, উপকথা রূপকথা, অর্থ> অম্বল, জমি জমিন ইত্যাদি।


খ. ধ্বনি লোপ উচ্চারণের সুবিধার্থে এক একাধিক ধ্বনির লোপকে ধ্বনি লোপ বলে। যেমন জানালা জানলা, সুবর্ণ স্বর্ণ, ফাল্গুন > ফাল্গুন, বউদিদি > বউদি ইত্যাদি।


গ. ধ্বনি রূপান্তর : একটি ধ্বনি ভিন্ন ধ্বনির সংস্পর্শে এলে একটির প্রভাবে অন্যটি বদলে যেতে পারে। বিভিন্ন কারণে এ ধ্বনির বদল হয়। যেমন- মোজা > মুজো, বিলাতি>বিলিতি, বিকাল > বিকেল, পদ্ম> পদ্দ, শরীর শরীল, পানি> হানি, বড়দা বদ্দা ইত্যাদি।


ঘ. ধ্বনির স্থানান্তর : ধ্বনির স্থানান্তরের মাধ্যমেও ধ্বনির পরিবর্তন হয়। অপিনিহিতি ও ধ্বনি বিপর্যয় এর উদাহরণ। যেমনঃ সাধু > সাউধ, আশু > আউশ, করিয়া > কইরা, আজি > আইজ, রিকশা রিশকা, চানাচুর > চাচানুর ইত্যাদি। 


৩. নবান্ন শব্দটি ধ্বনিগতভাবে কোন নিয়মে গঠিত? 

ক. সমাস

খ. সন্ধি

গ. প্রত্যয়

য. উপসর্গ

ব্যাখ্যা : এই ধরনের প্রশ্ন অনেক সময় পরীক্ষায় আসে যা আমাদের বেশ পীড়া দেয়। মনে রাখতে হতে- সন্ধিঘটিত শব্দ বিভিন্ন উপায়ে গঠিত হতে পারে। তবে এখানে প্রশ্নে 'ধ্বনিগতভাবে' শব্দটি গঠনের কথা বলা হচ্ছে। তাই উত্তর হবে (খ)।


মনে রাখতে হবে -

 ➢ শব্দের আদিস্বরের যদি পরিবর্তন হয়, তবে তা নির্দ্বিধায় প্রত্যয়ঘটিত শব্দ। যেমন ইতিহাস+ ইক= ঐতিহাসিক। 

 ➢ যদি অর্থের প্রাধান্য থাকে, তবে তা সমাসযোগে গঠিত হবে। যেমন- বিদ্যালয় (পাঠের স্থান), নবান্ন উৎসব)। যদি আদিস্বরের পরিবর্তন না হয়, তবে তা নির্ণয়ে কিছু সূত্র মনে রাখতে হবে। 


শব্দ গঠনের সূত্র- উপসর্গ > প্রত্যয় > সমাস> সন্ধি।


ক. উপসর্গ যোগে : পরি + অন্ত = পর্যন্ত ; দুঃ + যোগ = দুর্যোগ, সু + আগত = স্বাগত। 


খ. প্রত্যয় যোগে দ্বীপ + আয়ন = দ্বৈপায়ন, পতৎ + অঞ্জলি, তৎক্ষণ + ইক = তাৎক্ষণিক।


তবে প্রত্যয়ের নিজস্ব কোনো অর্থ থাকে না এবং সাধারণত প্রত্যয়ের ফলে শব্দের আদি স্বরের পরিবর্তন ঘটে। 

গ. সমাস যোগে : বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয়, যশঃ + ইচ্ছা = যশোচ্ছা, ইতি + আদি ইত্যাদি।


মূলকথা— যদি সন্ধির সাথে অন্যান্য টপিকের মিলে যায় তবে সন্ধির অবস্থান সবার শেষে হবে। এক্ষেত্রে উপসর্গ (যদি উপসর্গ দিয়ে গঠিত হয়), প্রত্যয় (যদি দুটোই অর্থবোধক শব্দ না হয়), সমাস (যদি দুটোই অর্থবোধ শব্দ হয় এবং অর্থের প্রাধান্য থাকে)।

 আর যদি উপসর্গ+ অর্থবোধক শব্দ (অব্যয়ীভাব সমাস) হয় তবে সমাসকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। যেমন- হাভাত, দুর্নীতি।। 

অন্যদিকে উপসর্গ+ প্রত্যয়ঘটিত শব্দ যদি হয়, তবে উপসর্গকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। যেমন- সুদর্শন, প্রচলন।



ধন্যবাদ, এতটুকু পড়ার জন্য। 

ভালো লাগলে পোস্টের লিংক বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। নিজের নামে না চালানোর অনুরোধ রইল।






Post a Comment

0 Comments